বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক : | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের মানুষ নগদ টাকার বদলে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের দিকে ঝুঁকছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ। একই সময়ে এসব কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ৯১ শতাংশ। শুধু দেশের ভেতরের কেনাকাটা নয়, বিদেশেও বাড়ছে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের ব্যয়ের প্রবণতা। শুধু ২০২৬ সালের জুন মাসেই বাংলাদেশি নাগরিকরা ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে খরচ করেছেন ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এক মাসের ব্যবধানে খরচ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশিরা বাংলাদেশে যত টাকা কার্ডে খরচ করেছেন, বাংলাদেশিরা বিদেশে খরচ করেছেন তার প্রায় ৪.২৯ গুণ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্ড ব্যবহারের বিস্তার আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ, লেনদেনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কাগুজে নোটের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে কার্ডভিত্তিক অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং গ্রাহক সচেতনতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গ্রাহকদের কার্ড ব্যবহারের সুবিধা ও ঝুঁকি সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে সচেতন ও প্রশিক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
পাঁচ বছরে কার্ড বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, লেনদেন বেড়েছে ৯১ শতাংশ : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুলাইয়ে দেশে ডেবিট কার্ড ছিল ২ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার ৮৮৬টি। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৬টিতে। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ড ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩২টি থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭ লাখ ৫০ হাজার ৫১৩টি। সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে প্রিপেইড কার্ড। ২০২১ সালের জুলাইয়ে যেখানে প্রিপেইড কার্ড ছিল ৯ লাখ ৫৪ হাজার ৬৭৩টি, ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ৯৬ হাজার ৭১২টিতে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা যথাক্রমে ৩৫ ও ৩০ শতাংশ বাড়লেও প্রিপেইড কার্ড বেড়েছে ১৫৭ শতাংশ। কার্ডের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে লেনদেনও বেড়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে তিন ধরনের কার্ডে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৪৯৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার ৮১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে লেনদেন বেড়েছে ৯১ শতাংশ।
দেশের ভেতরে দৈনন্দিন কেনাকাটায় বাড়ছে কার্ডের ব্যবহার : কার্ড ব্যবহারের বড় অংশই হচ্ছে দৈনন্দিন কেনাকাটায়। জুন মাসে দেশের ভেতরে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। মে মাসে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে ক্রেডিট কার্ডে অভ্যন্তরীণ লেনদেন বেড়েছে ৪ দশমিক ০৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৯১.১১ শতাংশই খরচ হয়েছে কেনাকাটায়। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। মে মাসে এসব দোকানে ক্রেডিট কার্ডে খরচ হয়েছিল ২ হাজার ৬৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৭২ কোটি ৯০ লাখ টাকায়। এর বাইরে বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল, সরকারি সেবা, চিকিৎসা ও ফার্মেসি, ব্যবসায়িক সেবা ও পরিবহনে বেড়েছে কার্ডের ব্যবহার। অর্থাৎ মানুষের হাতে থাকা ক্রেডিট কার্ড এখন শুধু জরুরি সময়ে নগদ টাকা তোলার মাধ্যম নয়; বরং দৈনন্দিন কেনাকাটার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি খরচ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র : দেশের বাইরে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের খরচও কম নয়। জুন মাসে শুধু ক্রেডিট কার্ডেই বিদেশে লেনদেন হয়েছে ৫৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। মে মাসে এ পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি টাকা। বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৮৩ কোটি টাকা, যা মোট লেনদেনের ৩৩ দশমিক ১০ শতাংশ। এরপর রিটেইল আউটলেট সার্ভিসে ৯৭ কোটি ৯ লাখ, পরিবহনে ৬৩ কোটি ৯০ লাখ, ওষুধ ও ফার্মেসিতে ৫৯ কোটি, পোশাকের দোকানে ৩৯ কোটি ৭০ লাখ এবং ব্যবসায়িক সেবায় ৩৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। দেশভিত্তিক হিসাবেও যুক্তরাষ্ট্র সবার ওপরে। জুনে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের মোট বিদেশি লেনদেনের ১৫.৪০ শতাংশ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর থাইল্যান্ডে ১০.৫৯ শতাংশ, সৌদি আরবে ৮.৯৭ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৮.৩৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৭.৩২ শতাংশ, ভারতে ৬.৭৯ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৬.০৮ শতাংশ লেনদেন হয়েছে।
তিন কার্ডে বিদেশে হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় : জুনে বিদেশে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড এই তিন ধরনের কার্ড মিলিয়ে মোট ১০.৩৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা খরচ করেছেন বাংলাদেশি কার্ডধারীরা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪১২টি লেনদেনের মাধ্যমে খরচ হয়েছে ৫৫২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ডেবিট কার্ডে ৮ লাখ ১৫ হাজার ৭১৯টি লেনদেনে খরচ হয়েছে ৪২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। আর প্রিপেইড কার্ডে ১ লাখ ২২ হাজার ২৫টি লেনদেনে ব্যয় হয়েছে ৬১ কোটি ১০ লাখ টাকা। মে মাসে তিন ধরনের কার্ডে বিদেশে মোট খরচ ছিল ৮১৩ কোটি টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে বিদেশে কার্ডে খরচ বেশ বেড়েছে প্রায় ২২৪ কোটি টাকা বা ২৭.৫৫ শতাংশ।
নগদ থেকে ডিজিটালে, সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ : কার্ডের ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশের পুরোপুরি ক্যাশলেস অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথে বেশ কিছু বাধা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অপর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামো, কম আর্থিক সাক্ষরতা, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতি আস্থার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘদিনের নগদনির্ভর সংস্কৃতি, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার, তুলনামূলক বেশি লেনদেন ব্যয় এবং সীমিত স্মার্টফোন অ্যাক্সেস। ফলে কার্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার ঘটলেও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমিয়ে আনা এখনও সহজ নয়।
Posted ১০:১০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh